দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের একাধিক প্রকল্পে কর্মকর্তা বদলি-পদায়নে সচিব মো. মোহসীনের একক রাজত্ব চলছে। ইচ্ছেমতো তিনি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) পদে বদলি-পদায়ন করছেন।
কিন্তু বিষয়টি মন্ত্রী কিংবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) জানেন না। এ ধরনের অনিয়ম ছাড়ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের রক্ষার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
নিয়ম অনুযায়ী মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলির প্রস্তাবক হয় অধিদপ্তর। আর অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়। কিন্তু সম্প্রতি বদলিসংক্রান্ত বিষয়ে অধিদপ্তর কিছুই জানছে না। বদলি-পদায়ন সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আতিকুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রতি এমন কিছু বদলির ঘটনা ঘটেছে যেগুলোর প্রয়োজন ছিল বলে অধিদপ্তর মনে করে না। বদলির কোনো প্রস্তাবও আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠাইনি।’
বদলির সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে, সেটা মানা হচ্ছে না-এমন অভিযোগের বিষয়ে আতিকুল বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে যেসব বদলি হয় সে বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে পারি না।’ দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন ছাড়া এভাবে বদলির আদেশ হয় না। এসব বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী খোঁজ না নেওয়ায় সচিব বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তার কর্তৃত্বের কাছে অসহায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলির কথা আপনার কাছ থেকে শুনলাম। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ সংক্রান্ত বিষয়ে আমার কোনো আত্মীয়-স্বজন জড়িত থাকার সুযোগ নেই। একটি গোষ্ঠী আছে তারা অপপ্রচার চালায়।’
এসব বিষয়ে জানতে সচিব মো. মোহসীনকে সোমবার ফোন করলে তিনি বৈঠকে আছেন বলে কলব্যাক করার কথা জানান। কিন্তু বলব্যাক করেননি। পরদিন তাকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এরপর বুধবার দপ্তরে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার আবার তার দপ্তরে গিয়ে দেখা মেলে। এ সময় তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগ ঠিক নয়। নিয়মের বাইরে কিছু করা হচ্ছে না।’ বদলি পদায়ন সংক্রান্ত নির্দেশিকা উপেক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করলে সচিব ভিন্ন প্রসঙ্গ টেনে বলেন, কিছু মানুষ আছে তারা এমনিতেই নানান অভিযোগ করেন, বুঝেন-ই তো।’
গত ১৬ জানুয়ারি মানিকগঞ্জ জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আওলাদ হোসেনকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বাস্তবায়নাধীন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিপি) হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ‘গ্রামীণ মাটির রাস্তাসমূহ টেকসইকরণের লক্ষ্যে হেরিং বোন বন্ড (এইচবিবি) করণ (দ্বিতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের ডিপিপি নিয়োগ পাওয়া আওলাদ হোসেনের বাড়ি সচিবের জেলা গাজীপুরে। কিছু দিন আগে এই প্রকল্প থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়া হলেও সচিবের কল্যাণে তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরেছেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, মাঠে জনবল কম থাকায় বিভিন্ন প্রকল্প থেকে জনবল কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু আওলাদ হোসেনকে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে তার উলটো বার্তাই দিয়েছেন সচিব। তা ছাড়া অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের জন্য অধিদপ্তর থেকে প্রস্তাব আসে, কিন্তু আওলাদের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা শাখা থেকে সরাসরি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে।
এর আগে মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু/কালভার্ট নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের উপ-পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয় গাজীপুর জেলার ডিআরআরও ইসমাইল হোসেনকে। গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও অধিদপ্তরের প্রস্তাব ছিল না বলে জানা গেছে। এই বদলির আদেশও হয়েছে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অধিশাখা থেকে। দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, সচিব মো. মোহসীনের চাকরির মেয়াদ প্রায় শেষ। বিএনপির সাবেক এক মন্ত্রীর পিএস থেকে সচিব পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাগাতে পারছেন না। তাই চাকরির শেষ মেয়াদে এসে কাউকেই তোয়াক্কা করছেন না তিনি।
সূত্র জানায়, ১১ জানুয়ারি গাজীপুর সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে রাঙামাটির জুরাছড়িতে বদলি করা হয়। এটি করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ প্রশাসন শাখা থেকে। ১১ নভেম্বর মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার পিআইও শাহরিয়ার মাহমুদ রঞ্জুকে গাজীপুর সদর এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দ্বিতীয় শ্রেণির পিআইও জাহাঙ্গীর আলমকে একই জেলার সাটুরিয়ায় বদলি করা হয়। এই আদেশটি হয় মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ প্রশাসন অধিশাখা থেকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, সচিব কোন পর্যায়ে নেমেছেন যে, দ্বিতীয় শ্রেণির পিআইও পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে বদলি করান।
এভাবে গত কয়েক মাসে পঞ্চগড়, বাগেরহাট, গাইবান্ধা, রাজশাহী চাঁদপুর টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, ঢাকা, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, নড়াইল ও গোপালগঞ্জের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) এবং পিআইও বদলি করেছেন সচিব মোহসীন। সংশ্লিষ্টরা জানান, মাঠ প্রশাসনে এ সংক্রান্ত কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অফিসারের সংকট রয়েছে। এক জায়গায় বদলি করলেই বিভিন্ন জায়গা থেকে বদলির তদবির শুরু হয়। তাই অধিদপ্তর থেকে সহজে বদলির সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় না। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আহাদী হোসেনের স্ত্রী ক্যানসারে আক্রান্ত। প্রতি মাসে স্ত্রীকে থেরাপি দিতে তাকে ঢাকায় আসতে হয়। দুই বছর আগ থেকে তিনি ঢাকা বা আশপাশের এলাকায় বদলি হতে চাইছেন, কিন্তু পারছেন না। মানবিক বিষয় বিবেচনায় সম্প্রতি পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম এই পিআইও’র বদলির জন্য দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমানকে বলেন। প্রতিমন্ত্রী সচিবকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই পিআইও’র বদলি হয়নি। শনিবার আহাদী আলী যুগান্তরকে বলেন, ব্যক্তিগতভাবে অনেক চেষ্টা করেছি, হয়নি। এখন উপমন্ত্রী মহোদয় বলে দিয়েছেন; দেখি কী হয়।’
সচিবের অনিয়মের উদাহরণ দিয়ে একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বলেন, ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (সিপিপি) প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। এর সুবর্ণজয়ন্তী পালন হওয়ার কথা ২০২৩ সালে। কিন্তু সচিব মোহসীন কৌশলে গত বছরই সিপিপি’র পঞ্চাশ বছর পূর্তি পালন করেন। এর পেছনে মূল কারণ বড় অঙ্কের টাকা খরচ।
সিপিপিতে ১০৮ জন কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। কিন্তু এই অভিযোগ নাকচ করেছিলেন সচিব। যদিও উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তদন্ত হলে দুর্নীতির বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর নিজের আর্শীবাদপুষ্ট কর্মকর্তাদের দুর্নীতির তদন্ত ফাইল চাপা দিয়ে রাখেন সচিব। এ বিষয়ে সচিব মো. মোহসীন বলেন, তদন্ত শেষ হয়েছে ঠিক। এখন সংসদীয় কমিটির আরেকটি তদন্ত চলছে। সেটা শেষ না হলে এটা প্রকাশ করা হবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব জানান, সচিবের আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তাদের দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশ হলে কার্যত তার (সচিব) নিজের দুর্নীতিই প্রকাশ হয়ে পড়বে। তাই অবসরে যাওয়ার আগে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করার ফন্দি এঁটেছেন সচিব মোহসীন।