আড়াই বছরেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শাখা ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি। দুই সদস্যের (সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক) কমিটি দিয়েই চলছে এই শাখার কার্যক্রম। আধিপত্য বিস্তার ও কমিটি নিয়ে অন্তর্কলহে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। তাতেও কোনো সুরাহা হয়নি। সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি রাতে সংঘর্ষে জড়ায় বিবদমান দুই পক্ষ। এতে উভয় পক্ষের কমপক্ষে ১২ নেতাকর্মী আহত হন। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের আশ্বাস অনুযায়ী ২৫ জানুয়ারির (মঙ্গলবার) মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হয়নি। তাই নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। তবে চবি ছাত্রলীগ নেতারা বলছেন, কমিটির একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।
সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই এক বছরের জন্য চবি ছাত্রলীগের দুই সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে ২০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে বলা হয়। কিন্তু নানা অজুহাতে থমকে যায় কমিটি গঠনের কার্যক্রম। ফলে দুই সদস্যের কমিটিই চলছে আড়াই বছর ধরে।
সূত্র আরও জানায়, দুই গ্রুপে বিভক্ত চবি শাখা ছাত্রলীগের রাজনীতি। ক্যাম্পাসের একটি পক্ষ সাবেক সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন এবং অপরটি শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী হিসাবে পরিচিত। দুই পক্ষ আবার ১১টি উপপক্ষে বিভক্ত। যার মধ্যে প্রধান তিনটি পক্ষ হচ্ছে বিজয়, সিএফসি ও সিক্সটি নাইন। এই তিনটি পক্ষের মধ্যে বিজয় ও সিএফসি নেতারা মহিবুল হাসান চৌধুরীর অনুসারী। আর সিক্সটি নাইন নাছির অনুসারী হিসাবে পরিচিত।
১৩ জানুয়ারি চবি ছাত্রলীগের কার্যক্রম দেখতে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক হায়দার মোহাম্মদ ও উপসংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক শেখ নাজমুল ইসলাম। ওইদিন কমিটি পূর্ণাঙ্গের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকেই তাদের আধা ঘণ্টা আটকে রাখেন বিভিন্ন উপপক্ষের শতাধিক নেতাকর্মী। সেখানে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার আশ্বাস দেওয়া হয়। এই আশ্বাসের পর থেকে ক্যাম্পাসে বেড়ে গেছে বিভিন্ন উপগ্রুপের আধিপত্য বিস্তার ও শক্তি দেখানোর প্রতিযোগিতা।
সূত্রমতে, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ছাত্রলীগের বিভিন্ন উপপক্ষের নেতাকর্মীরা অন্তত ৩০ বার সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। চলতি মাসের মধ্যে কমিটি না হলে সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত বছরের ৯ নভেম্বর চবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন টিপু স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পেতে আগ্রহী কর্মীদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত চাওয়া হয়। ২৮ নভেম্বরের মধ্যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে এসব জীবনবৃত্তান্ত জমা দিতে বলা হয়েছিল। সে অনুযায়ী ১ হাজার ৪শ আবেদন জমা পড়ে বলে জানিয়েছেন চবি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক রুবেল। তিনি যুগান্তরকে বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে থাকতে ইচ্ছুক এমন এক হাজার চারশ জন আবেদন করেছিল। তাদের মধ্য থেকে বাছাই করে আমরা একটি কমিটির খসড়া তৈরি করেছি। খসড়া কেন্দ্রে পাঠিয়েছি।
তবে এ নিয়ে ভিন্ন মন্তব্য করেছেন চবির বগিভিত্তিক উপপক্ষ বিজয়ের নেতা ও ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইলিয়াছ। তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটির দাবি জানিয়ে আসছিলাম। কিন্তু অদৃশ্য কারণে এ ব্যাপারে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক উদাসীন। তারা (সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক) আবেদন সংগ্রহের যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল, সেসময় একজনও আবেদন করেননি।
সর্বশেষ ১৮ জানুয়ারি চবির উপপক্ষ বিজয় ও চুজ ফ্রেন্ডস উইথ কেয়ারের মধ্যে (সিএফসি) সংঘর্ষ বাধে। বিবদমান দুটি পক্ষই শিক্ষা উপমন্ত্রীর অনুসারী হিসাবে পরিচিত। বিজয়ের নেতাকর্মীদের দাবি, রাতের আঁধারে বিনা উসকানিতে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে সিএফসির নেতাকর্মীরা বলেছেন, কয়েক দিন ধরে বিজয়ের নেতাকর্মীরা ‘স্লেজিং’ করেছেন। এর জবাবে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে চবি কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতাকর্মী জানান, বর্তমানে হলে থাকা ছাত্রলীগের বিভিন্ন উপপক্ষের মধ্যে কমিটি গঠন নিয়ে উত্তেজনা রয়েছে। দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা না হলে আবারও সংঘাত-সহিংসতা ঘটতে পারে।